ঢাকা, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮, ১ পৌষ ১৪২৫
---
---
Demo Newspaper
প্রচ্ছদ » মতামত » খালি হাতে ফিরে গেলি মা
শনিবার ● ৮ আগস্ট ২০১৫
Decrease Font Size Increase Font Size Email this News Print Friendly Version

খালি হাতে ফিরে গেলি মা

---কবিকিশোর সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি।’ কী গভীর প্রত্যয়ে এ কথা উচ্চারণ করেছিলেন কবি। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন যে অধরাই থেকে গেল, সে কথা বুঝতে কাব্যপাঠক বা সমঝদার হওয়ার প্রয়োজন নেই। আজ চারপাশের বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে শিশুদের জন্য আরও নির্মম-কঠিন, আরও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে এই দেশ। চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা (রাজন), চোখে আঘাত করে হত্যা (রবিউল), শরীরে কমপ্রেসর যন্ত্র দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা (রাকিব), জিন তাড়ানোর নামে পিটিয়ে হত্যা (সুমাইয়া) প্রভৃতি। হেন কোনো অমানবিক পদ্ধতি নেই, যা শিশুদের ওপর প্রয়োগ করা হয়নি। পত্রিকার পাতা ওল্টালে এসব সংবাদ আমাদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে রাখে। মর্ত্যের পৃথিবী তো বটেই, এমনকি মাতৃজঠরও আজ আর নিরাপদ নয় শিশুর জন্য। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই গুলিবিদ্ধ হওয়া অবিকশিত অপাপবিদ্ধ শিশুর যন্ত্রণাদীর্ণ মুখটিও আমাদের জানিয়ে দিয়েছে এই দেশ, এই সমাজ শিশুর জন্য কতটা বাসযোগ্য!
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে এক সদ্য প্রসবার জীবনে নেমে এসেছে এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। আরও অজস্র ঘটনা-দুর্ঘটনার অভিঘাতে আমরা হয়তো একদিন ভুলে যাব সেই ঘটনা। কিন্তু জেসমিন আক্তারের জীবন থেকে সেই হাহাকার কোনো দিন হারিয়ে যাবে না। অনিদ্র রাতের দুঃস্বপ্ন থেকে বাকি জীবন তো মুক্তি পাবেন না তিনি।
চমেক হাসপাতালে গত ২ জুলাই দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন জেসমিন। অস্ত্রোপচারের স্থানে সংক্রমণ হওয়ায় হাসপাতালের প্রসবোত্তর ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। কিন্তু ১৫ জুলাই হাসপাতালের শয্যা থেকে চুরি হয়ে গেল তাঁর নবজাতক পুত্রটি। বড় ছেলে আড়াই বছর বয়সী সৈকত খেলতে খেলতে ওয়ার্ডের বাইরে চলে গেলে তাকে খুঁজতে বাইরে এসেছিলেন জেসমিন আক্তার। এদিকে জেসমিনের মা-ও এ সময় গিয়েছিলেন শৌচাগারে। সব মিলিয়ে কয়েক মিনিটের মাত্র অনুপস্থিতি। এর মধ্যেই শয্যা থেকে চুরি হয়ে গেল নবজাতকটি।
অদ্ভুত দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে এই কাজটি সমাধা করে ফেলল চোর। ওয়ার্ডভর্তি মানুষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কী অনায়াসে হাসপাতালের এত বড় আঙিনা ছেড়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারল, ভেবে অবাক হতে হয়। সিসিটিভির পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রহরা—এসব বজ্র আঁটুনি মুহূর্তেই যেন পরিণত হলো ফসকা গেরোতে। এখন চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় চিকিৎসালয়টির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মুখে জবাবদিহির আর কোনো ভাষা নেই!
শিশু চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে হাসপাতালেরই এক নিরাপত্তারক্ষী (বেসরকারি) ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। শিশু চুরির সঙ্গে ওই দুজনের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, আমরা জানি না। তবে হাসপাতালের কোনো কর্মচারী বা প্রতিদিন এখানে যাতায়াত আছে, এমন স্থানীয় ফার্মেসি ও রোগনির্ণয় কেন্দ্রের দালাল শ্রেণির লোক যে এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, অপরিচিত লোকের পক্ষে এত দ্রুত এই কাজ সম্পাদন করা মোটেও সম্ভব নয়। তদুপরি কিছুদিন ধরে যে হাসপাতালের সিসিটিভি বিকল হয়ে আছে, এ তথ্যও জানা ছিল অপরাধীর।
চমেক হাসপাতালে নবজাতক শিশু চুরির ঘটনা এটিই প্রথম নয়। অতীতে বেশ কয়েকবার এ রকম ঘটনা ঘটেছে। তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার ও সিসিটিভি ক্যামেরার পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালু করার পর এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম আবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।
এ কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না, জনবহুল এই দেশে সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা এখনো দুষ্প্রাপ্য। নিম্ন আয়ের মানুষেরা অধিকতর বঞ্চিত। ফলে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বা লোকবল কম থাকলেও তাতে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র চমেক হাসপাতালে তাই ধারণক্ষমতা ও শয্যাসংখ্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। চিকিৎসক ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয় এই বিপুলসংখ্যক রোগী সামাল দিতে। কিন্তু এই সমগ্র কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যেহেতু মানুষের জীবন-মরণ অর্থাৎ মানবিকতার সম্পর্ক, স্বাভাবিকভাবেই এখানে অনেক বেশি যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হবে।
চমেক হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরা বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকে। প্রায় প্রতিদিনই রোগী ও স্বজনদের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। সম্প্রতি ১০০ আনসার চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরষের ভেতরই যেখানে ভূত, সেখানে ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থা করা দুরূহ। জেসমিনের সন্তান চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের একজন নিরাপত্তারক্ষী সুজন দত্ত, আরেকজন সুজনেরই স্ত্রী রীনা হাসপাতালের ‘দালাল’ হিসেবে পরিচিত। হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে দালালদের উৎপাত সবচেয়ে বেশি। এখানে ওষুধের স্লিপ নেওয়ার জন্য হাসপাতালের আশপাশের ফার্মেসির দালালেরা ঘোরাঘুরি করেন। স্লিপ নিয়ে চলে কাড়াকাড়ি। এক হাজার টাকার ওষুধের দাম পড়ে দেড়-দুই হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু রোগনির্ণয় কেন্দ্রে পাঠানো হয় রোগীদের। এসব কাজে চিকিৎসক সংগঠনের নেতারা প্রভাব খাটান বলেও অভিযোগ আছে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি চিকিৎসক বা টেকনিশিয়ানদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তো আছেই। গত জুলাই মাসে এক্স-রে করাতে এসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এক নারী। এক্স-রে টেকনোলজিস্ট তাঁর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন এক শিক্ষানবিশ ছাত্রের ওপর। ওই শিক্ষানবিশ ছাত্রটির হাতেই যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন রোগিণী। হায়, জীবন সংকটাপন্ন হলে হাসপাতালে ছুটে আসেন নারী, তাঁরও রক্ষা নেই এসব পশুর হাত থেকে!
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করি, চমেক হাসপাতালে এক বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান যন্ত্র। এক্স-রে যন্ত্রও পুরোনো। এই অঞ্চলের দরিদ্র রোগীদের কজনের পক্ষে ঢাকায় গিয়ে এসব রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সামর্থ্য আছে? সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি এসব ব্যাপারে বেসরকারি উদ্যোগও তো নেওয়া যেতে পারে। চট্টগ্রামে ধনাঢ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। তাঁরা তো সাহায্যের হাত বাড়াতে পারেন। সামাজিক বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও বা কেন এই কাজে উদ্বুদ্ধ করছেন না সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের?
জেসমিন আক্তার সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন রোজার মাসে। আগাম ঈদের খুশি নেমে এসেছিল দরিদ্র অটোরিকশাচালক শফিউল আলমের বাড়িতে। প্রায় তিন সপ্তাহ হাসপাতালে কাটিয়েছেন শফিউল নিজেও। চিকিৎসা বাবদ ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তাঁর। ধার-কর্জ করে সেই টাকা খরচ করেছিলেন সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে। কিন্তু সেই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না তাঁর। শূন্য হাতে বাড়ি ফেরার আগে পুলিশ ও চমেক প্রশাসন শফিউলদের বাড়ির ঠিকানা লিখে নিয়েছে। সেই ঠিকানায় একদিন সুখবর আসবে এই আশায় দিন কাটে শফিউলের। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, সেই খবর আর আসে না।
শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সন্তানসম্ভবা ও তাঁর জঠরের শিশুটি গুলিবিদ্ধ হলে সেই গৌরব কি আর থাকে? কোল আলো করে আসা শিশুপুত্রকে নিয়ে বাড়ি ফেরার বদলে যখন দুচোখে অঝোর ধারার বর্ষণ, সর্বস্ব হারানোর বেদনা নিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যান মা, তখন সব অর্জনই তো অর্থহীন হয়ে যায়!
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com


‘বঙ্গমাতা আদর্শ বাঙালি নারীর অনুপ্রেরণার উৎস’

বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিজয়


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)
পরীক্ষামূলকভাবে সিম নিবন্ধন শুরু হয়েছে
এসডিজি অর্জনে অর্থায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: সিপিডি
কোনালের ‘সুখ থামে না’
আব্বা মুক্ত থাকলে আমাদের ছিল ডাবল ঈদ
মেডিকেল ভর্তির ফল বাতিল চেয়ে করা রিট খারিজ
যে পোশাক অদৃশ্য করে দেবে
সবচেয়ে ধনী দেশ এখন কাতার
চাই জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন
ক্রোয়েশিয়ার দিকে ছুটছে অভিবাসন-প্রত্যাশীরা
লন্ডন পৌঁছেছেন খালেদা জিয়া