ঢাকা, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮, ১ পৌষ ১৪২৫
---
---
Demo Newspaper
প্রচ্ছদ » মতামত » শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী সমীপেই
সোমবার ● ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
Decrease Font Size Increase Font Size Email this News Print Friendly Version

শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী সমীপেই

---প্রথমে নিজের জীবনের গল্প বলি। আব্বা রিটায়ার করেছেন। আমার বড় ভাই মেডিকেল কলেজে পড়েন। আমার মেজ ভাই বুয়েটে পড়েন। আমার বোন মেডিকেলে পড়ে। ছোট ভাই স্কুলে। এই অবস্থায় আমি ভর্তি হলাম বুয়েটে। ইন্টারমিডিয়েটে আমি অষ্টম স্ট্যান্ড করেছি। মানে মেধাতালিকায় আমার সিরিয়াল ৮। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার সহপাঠী ইকবাল বাহার সপ্তম হয়েছে। ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি মানে মাসে ৪০০ টাকা। এটা যদি ইকবাল পায়, তাহলে আমি নাও পেতে পারি। তাহলে আমি বুয়েটে পড়ব কীভাবে?

বুয়েটে পড়তে কোনো টাকা লাগবে না। বৃত্তি পেলে বেতন মাফ। কিন্তু ডাইনিঙের খরচ তো জোগাড় করতে হবে।
এইভাবেই ১২ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছি-বৃত্তি পেতাম। স্কুলে বেতন লাগত না। উল্টো কিছু টাকা পেতাম। আমরা সব ভাইবোনই এইভাবে নিখরচায় পড়াশোনা করেছি।
আব্বা আমাকে বললেন, বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার ডাইনিংয়ের টাকা আমি কষ্ট করে হলেও পাঠাব। আমি ভীষণ সংকুচিত বোধ পেলাম। আমার জন্য আব্বাকে কষ্ট করতে হবে।
কিন্তু বুয়েটে ক্লাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারলাম, আমিও ট্যালেন্ট পুলেই বৃত্তি পাব। বছরে ৪৮০০ টাকা বৃত্তি, এক হাজার টাকা বই কেনার খরচ, ৫৮০০ টাকা পেয়ে যাব। বুয়েটে আমার খরচ মাসে ৫০০ টাকা। ৩০০ টাকা দিতে হয় ডাইনিং খরচ। ১২০ টাকা লাগে সকালের নাশতা। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৫০০ টাকা। মানে বছরে ছয় হাজার। সরকার দেয় ৫৮০০ টাকা। আর মাত্র ২০০ টাকা লাগবে। এটা হয়ে যাবে।
আব্বাকে রিলিফ দিতে পারলাম। কিন্তু আমাদের ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আব্বা’ আমার ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলার মধ্যখানে মারা গেলেন। পরীক্ষার ফাঁকে আমি রংপুরে গিয়ে আব্বাকে দাফন কাফন করে কুলখানি সেরে ঢাকা এলাম। পরের পরীক্ষা ফিজিকস। ফার্স্ট সেমিস্টারে ১০০তে ৭৮ পেয়েছি। সেকেন্ড সেমিস্টারে আর ২ পেলেই পাস করব। একটা অঙ্ক করে বললাম, স্যার, খাতা জমা নেন। স্যার বললেন, এক ঘণ্টার আগে খাতা জমা দেবার নিয়ম নাই। বসে থাকো। আমি বসে থাকলাম। প্রথম ঘণ্টা বাজল, আমি বেরিয়ে আসছি। আমার সেকশনের সবাই ভালো ছাত্র। আমার পায়ের আওয়াজে মাথা তুলে তাকাল, একটা পাগল বের হয়ে যাচ্ছে। আব্বাকে শ্রেষ্ঠ আব্বা বললাম, সবাই নিজের পিতাকেই শ্রেষ্ঠ বলবেন, আমার আব্বা ছিলেন প্রাইমারি শিক্ষকদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ, পড়াতেন শিশু মনোবিজ্ঞান, তিনি আমাদের সামনে আম্মাকে বলতেন, ডালটন বলেছেন, শিশুকে প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দাও, প্রকৃতিই শিশুকে শিক্ষা দেবে। আমার ছেলেমেয়েদের কেউ মারতে পারবে না। বকতেও পারবে না।
আমি সেকেন্ড ইয়ারে উঠলাম। আস্তে আস্তে হোস্টেলের খরচ বাড়তে লাগল। ৫০০ টাকায় আর হয় না। ৮০০ লাগে। আমার মেজ ভাই বুয়েট থেকে পাস করে রাজশাহী বিআইটির টিচার হলেন। নিজে ৪ হাজার টাকা বেতন পান, সেখান থেকে বছরে তিন/চার মাস আমাকে তিনি ৮০০ টাকা করে দেন। আমি পাস না করা পর্যন্ত তিনি এটা দিয়ে গেছেন।
সরকার যদি আমাদের টিউশন ফি না দিত, আমি পড়তে পারতাম না। সরকার যদি আমাকে বৃত্তি না দিত, আমার পড়াশোনা হতো না। তারপরেও আমার হোস্টেলের টাকা জোগাড় করতে কষ্ট হয়েছে।
এই জন্য যখন কেউ বলে, আমার দেশ আমাকে কী দিয়েছে, আমি ক্ষেপে যাই। আমার দেশ আমাকে জন্ম দিয়েছে, আমাকে অন্ন-পানি-অক্সিজেন দিয়েছে, আর সবচেয়ে বড় কথা বিনা পয়সায় শিক্ষা দিয়েছে। আমার জীবনের রক্ত পানি করে দিলেও দেশের এই ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। এই কথাটা আমি সাকিব আল হাসানকেও বলি, বিকেএসপি এই দেশের মানুষের ঘাম নিংড়ানো টাকায় চলে, ওখানে পড়েছ, এই কথা কোনো দিনও ভুলো না। আজ তুমি যা হয়েছ, তা তুমি এই দেশে জন্মেছ বলে হয়েছ।
কাজেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে, তাদের জন্য আমার মায়া হয়। আমাদেরই ছেলেমেয়ে ওরা, বৈষম্যের শিকার। আমরা যে জিপিএ পদ্ধতিতে রেজাল্ট দিই, সেটা তো বৈষম্য না করার জন্য। কিন্তু ওরা বৈষম্যের শিকার হয়েছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি। একখানে বেতন ৪০ টাকা, আরেক জায়গায় হয়তো মাসে বেতন ১৫ হাজার টাকা। কম বা বেশি আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোর সদস্যই বেশি। কারণ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়াতেও সুবিধা পায়, তাদের রেজাল্ট ভালো হয়, তারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বুয়েটে, মেডিকেলে সুযোগ পায়।
আমার নিজের ক্ষেত্রে বলি, মাসে এক শ টাকা জোগাড় করাও আমার জন্য কঠিন ছিল। টিউশন ফি তো ছিলই না, বৃত্তি পেয়েছি, কিন্তু হলের ডাইনিঙের টাকা তো লাগবেই। এই ছেলেমেয়েরা নিজেদের চলাফেরা খাওয়া বইপত্র কম্পিউটারের টাকা তো জোগাড় করেই, তারপর আবার টিউশন ফি দেয়। তারা বড় বৈষম্যের শিকার।
তাহলে কী করা উচিত। আমি যা বলতে চাই, তা বললে, রাস্তাঘাটে পিটুনি খাওয়ার অবকাশ আছে। আর সেটা বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কঠিন। ভয়ে ভয়ে আমি বলব, উচ্চ শিক্ষায় টিউশন ফি হওয়া উচিত অভিভাবকের সামর্থ্য অনুসারে। ভর্তি হবে মেধা অনুসারে, বেতন দেবে সামর্থ্য অনুসারে। আর যারা অদম্য মেধাবী, একেবারেই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে, তারা বেতন তো দেবেই না, তারা উল্টো বৃত্তি পাবে, এতটাই পাবে যে, তাদের থাকা-খাওয়া, বইপত্র কম্পিউটার কেনার দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নেবে। আর যার বাবার টাকা আছে, ধরা যাক, তিনি মেয়র আনিসুল হকের ছেলে বা মেয়ে, তিনি কয়েক লাখ টাকা টিউশন ফি দেবেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপারটা গোপন রাখবে। আমেরিকায় কিংবা আমাদের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে তাই করা হয়। সবাই ছাত্র। কে কত টাকা টিউশন ফি দিচ্ছে, সেটা অন্য কাউকে জানানো হয় না, এটা নিয়ে আলাপ নিষেধ। হান্ড্রেড পারসেন্ট মওকুফ নাকি দু হান্ড্রেড পারসেন্ট ফি দিতে হচ্ছে, এই নিয়ে কেউ যেন হীনম্মন্যতা বা উচ্চমন্যতায় না ভোগে।
আমাদের দেশের মুশকিল হলো, আমরা যদি গরিবদের জন্য বৃত্তি চালু করি, বড়লোকদের জন্য টিউশনি ফি, কে এটা পাওয়ার যোগ্য, তা বাছাই করা কঠিন হবে। কারণ একজন মিটার রিডার বলবেন, আমি বেতন পাই কম, কাজেই আমার ছেলে মাফ পাবে। কিন্তু ঢাকায় তার ৬টা ফ্ল্যাট আছে। আর এই জাতীয় সুযোগ-সুবিধা যে সুবিধাপ্রাপ্তরাই গ্রাস করেন, সাংসদদের শুল্কবিহীন গাড়ি তার প্রমাণ।
এখন আসি বর্তমান সংকট নিয়ে। আমি মনে করি, সরকারের উচিত জনমত যাচাই করা। একটা সরকারের জন্য জনগণের চাওয়া ও পাওয়া অনেক বড় ফ্যাক্টর, অনেক বড় নিয়ামক। সরকারকে দেখতে হবে, কী করলে তার লাভ হবে, জনগণের লাভ হবে, দেশের ভালো হবে। দুই পা সামনে বাড়ানোর জন্য এক পা পেছানোর দরকার পড়তে পারে। এতে ক্ষতি কিছু হয় না।
ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে চার লাখ ছেলেমেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এদের চাওয়া-পাওয়া আমলে নিতে হবে। বুদ্ধিমান সরকার তাই করবে।
আর শিক্ষার ওপরে ভ্যাট হয় কি হয় না, ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্সের মানে কী-এই সব কথায় আমি গেলাম না। আমার খালি চোখে যেটা মনে হয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদের ছেলেমেয়েরাই পড়ে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদের ছেলেমেয়েরাই পড়ে, সরকারিগুলোতেও অনেক সম্পন্ন পরিবারের ছেলেমেয়ে আছে, বেসরকারিগুলোতেও অনেক গরিব ছেলেমেয়ে আছে। এমনিতেও একদল বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্য আরও বাড়ানোর দরকার কী।
আরেকটা কথা বলতে চাই ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হককে। তিনি আমাদের নাগরিকদের পিতা। আমরা যে রাস্তায় বেরিয়ে আধঘণ্টার পথে ৬ ঘণ্টা আটকে থাকছি, তাতে কি তিনি বিচলিত বোধ করছেন? একদিন ঢাকা শহর অচল হলে অন্তত ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। দোকানপাটে কেনাকাটা হয় না, ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেন হয় না। তেল-গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইডের ক্ষতি, শ্রমঘণ্টার ক্ষতি ধরলে এই ক্ষতি অপূরণীয়। আপনি কি সরকারকে বলবেন, ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করতে। এদের তো জোর করে তুলেও দেয় না (সে চেষ্টা করা হবে সাংঘাতিক ভুল), আবার এদের ডেকে কেউ বলেও না যে তোমরা ওঠো, কিংবা সরকার ঘোষণাও দেয় না যে ভ্যাট নেওয়া হবে না। ভাই রে, আমাদের তো কাজকর্ম আছে। আমাদের কষ্ট কি আপনাকে কষ্ট দেয় না?
আমি ভাবছিলাম শিক্ষামন্ত্রীকে আবেদন জানানোর কথা। শুনলাম তিনি বিদেশে। এখন বোধ হয় আমাদের শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী সমীপেই আবেদন জানাতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের বহু সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। এটাও করুন। আপনি কাউকে দায়িত্ব দিন সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলতে। যেকোনো সংকট নতুন সম্ভাবনারও পথ তৈরি করে। আমার মনে হয়, আপনার দূরদর্শী কোনো পদক্ষেপ একই সঙ্গে সমস্যারও সমাধান করবে, আপনার জন্য দেশের জন্য নতুন কোনো সম্ভাবনার পথে আলো ফোটাবে। তবে সবচেয়ে সহজ আর সুন্দর ঘোষণা, সবচেয়ে স্মার্ট হবে-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে নেবার ঘোষণা।
কিন্তু ঘটনায় সরকারের কোনো নড়াচড়া নেই, সেটা দেখতে ভালো লাগছে না।


এখনো যেন সেই মিস ইউনিভার্স

রাজস্ব ফাঁকি ৪০ কোটি টাকা


পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)
পরীক্ষামূলকভাবে সিম নিবন্ধন শুরু হয়েছে
এসডিজি অর্জনে অর্থায়নই বড় চ্যালেঞ্জ: সিপিডি
কোনালের ‘সুখ থামে না’
আব্বা মুক্ত থাকলে আমাদের ছিল ডাবল ঈদ
মেডিকেল ভর্তির ফল বাতিল চেয়ে করা রিট খারিজ
যে পোশাক অদৃশ্য করে দেবে
সবচেয়ে ধনী দেশ এখন কাতার
চাই জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন
ক্রোয়েশিয়ার দিকে ছুটছে অভিবাসন-প্রত্যাশীরা
লন্ডন পৌঁছেছেন খালেদা জিয়া